কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে চিনির দাম বেড়েছে মণপ্রতি ১০৫ টাকা

দেশে শীতকালে চিনির চাহিদা সাধারণত কম থাকে। এর গত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে মণপ্রতি ১০৫ টাকা।

দেশে শীতকালে চিনির চাহিদা সাধারণত কম থাকে। এর গত কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে পণ্যটির দাম বেড়েছে মণপ্রতি ১০৫ টাকা। খাতসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, আসন্ন রমজান ঘিরে ব্যবসায়ীদের মধ্যে মজুদপ্রবণতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাবে দেশের বাজারে দাম বেড়েছে পণ্যটির।

দেশে ভোগ্যপণ্যের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজার খাতুনগঞ্জে গতকাল খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কয়েক সপ্তাহ আগেও দেশে প্রতি মণ (৩৭ দশমিক ৩২ কেজি) চিনির দাম ছিল ৩ হাজার ২০০ টাকা, বর্তমানে তা মণপ্রতি ৩ হাজার ৩০৫ টাকায় পৌঁছেছে।

সংশ্লিষ্টরা আরো জানান, দেশের বাজারে বেশ কয়েক মাস ধরেই নিম্নমুখী ছিল চিনির দাম। এ কারণে বড় ব্যবসায়ী গ্রুপগুলো পণ্যটি মজুদ করছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে রমজানে চিনির বাজার অস্থিতিশীল হওয়ার আশঙ্কা আছে। পাশাপাশি আমদানি বন্ধের সরকারি ঘোষণার কারণেও চিনির দাম বাড়ছে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ পাইকারি চিনি ডিলার সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আনোয়ার হোসেন চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, ‘শীতের কারণে চিনির চাহিদা কমে যাওয়ায় দামও কমে যায়। এছাড়া দেশের বাজারে পর্যাপ্ত সরবরাহও আছে। এ অবস্থায় আসন্ন রমজানের কারণেই পণ্যটির দাম বাড়ছে। তাছাড়া সরকারি মিলগুলোর উৎপাদিত চিনি দিয়ে আভ্যন্তরীণ বাজার স্থিতিশীল রাখার ঘোষণা দেয়া হলেও ডিলার পর্যায়ে সর্বশেষ এক টন হারে চিনি সরবরাহ করায় দাম না কমে উল্টো বাড়ছে।’

বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের (বিএসএফআইসি) কাছে বিগত বছরের উৎপাদিত ৪৬ হাজার টন চিনির মধ্যে এখনো ১৬ হাজার টন মজুদ রয়েছে। তাছাড়া সরকারি মিলগুলোর উৎপাদিত চিনির মধ্যে প্রায় ৩০ হাজার টন সরকারি বিভিন্ন বাহিনীর (পুলিশ, সেনা, নৌ, বিমান অন্যান্য) জন্য বরাদ্দ থাকে। এ হিসাবে বাকি চিনি প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ডিলারের কাছে বরাদ্দ দেয়া হয়। আগে বিএসএফআইসির সাত হাজারের বেশি ডিলার প্রতিষ্ঠান থাকলেও বর্তমানে তা ২ হাজার ৫০০টিতে নেমে এসেছে। মূলত নিবন্ধিত ছয় হাজার ডিলারের মধ্যে নিয়মিত মাসিক জমা দেয়া ডিলার সংখ্যা ২ হাজার ৫০০।

বিএসএফআইসির বিপণন বিভাগের তথ্যমতে, চলতি বছরের ৩ মার্চ ডিলারের ৫০০ কেজি করে চিনি উত্তোলনের বরাদ্দপত্র দেয় বিএসএফআইসি। তবে তুলনামূলক কম চিনি বরাদ্দের কারণে ১ হাজার ২৫০ টনের মধ্যে মাত্র ৪০০ টন চিনি উত্তোলন করেছে ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলো। সর্বশেষ ৩০ নভেম্বর ডিলারদের এক টন করে ২ হাজার ৫০০ টন চিনি বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। ব্যবসায়ীরা এ বিষয়ে জানান, দেশের বিভিন্ন প্রান্তের চিনিকল থেকে মাত্র এক টন চিনি সংগ্রহে ডিলার প্রতিষ্ঠানগুলোর বিড়ম্বনার কারণে উত্তোলন আবারো কমেছে। ফলে সীমিত পরিসরে বাজারে চিনি বিক্রির মাধ্যমে দাম ও বাজার স্থিতিশীলতায় উদ্যোগ নেয়া হলেও সেটি কার্যকর হচ্ছে না।

তারা আরো জানান, সারা দেশে চিনির বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২০-২১ লাখ টন। বিএসএফআইসিতে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনির দাম ১২৫ টাকা। গত ২৪ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটির ২ হাজার ৫৬১তম বোর্ড সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এ চিনি ২০২৬ সাল সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত উত্তোলনের সুযোগ পাবেন ব্যবসায়ীরা। কেজিপ্রতি ১২৫ টাকা বা উত্তোলনের দিন মিলগেটে যে দাম নির্ধারিত থাকে সে দামে উত্তোলনের পর সর্বোচ্চ ৭ টাকা বাড়িয়ে ১৩২ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন ব্যবসায়ীরা। দেশের পাইকারি বাজারে বর্তমানে কেজিপ্রতি আমদানির পর পরিশোধিত চিনি ৮৭-৮৮ টাকায় লেনদেন হলেও সরকারি মিলের চিনির দাম ১২৫ টাকা নির্ধারণের ফলে বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যত কোনো প্রভাবই রাখতে পারছে না বিএসএফআইসি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসএফআইসির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা মো. আকুল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমাদের প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত চিনির খরচের কারণে বাড়তি দামেই বিক্রি করতে হচ্ছে। বর্তমানে বেসরকারি পর্যায়ে উৎপাদিত চিনির দাম কমার কারণে সরকারি চিনির চাহিদাও কম। তবে মান ভালো হওয়ায় সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছেই উৎপাদিত চিনির দুই-তৃতীয়াংশ বিক্রি হয়ে যায়। ধারাবাহিকভাবে উৎপাদন বাড়ানো গেলে বেসরকারি পর্যায়ে সরবরাহ বাড়িয়ে দেশী চিনির বাজারকে স্থিতিশীল রাখতে বিএসএফআইসি ভূমিকা রাখতে পারবে।’

বিএসএফআইসি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি মিলের চিনির উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। আগে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে সরকারি মিলের খরচ ছিল ২৫০ টাকার বেশি। বর্তমানে আখের মূল্য বাড়ানোর ফলে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যয় হচ্ছে ৩০০ টাকার বেশি। একসময় দেশে চিনির দাম কেজিপ্রতি ৭০-৮০ টাকার মধ্যে থাকায় সরকারি মিলের চিনির দামও বাড়ানো সম্ভব হয়নি। তবে বিগত এক-দুই বছর আমদানীকৃত চিনির মূল্য বেড়ে যাওয়ার পর বিএসএফআইসি সরকারি চিনির দামও বাড়িয়ে পাইকারিতে কেজিপ্রতি ১২৫ টাকা নির্ধারণ করেছিল। এখন আমদানীকৃত চিনির দাম কমে গেলেও আপাতত সরকারি মিলের চিনির দাম কমাচ্ছে না।

আরও